১৩তম জাতীয় নির্বাচন
১৩তম জাতীয় নির্বাচন
গণতন্ত্রে ফেরার আজকের ভোট
আওয়ামী লীগ
সরকারের পতনের
দেড়
বছর
পর
আজ
বৃহস্পতিবার দেশের
জনগণ
ভোট
দিচ্ছেন একটি
নির্বাচিত সরকার
প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।
একই
সঙ্গে
গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানে কয়েকটি মৌলিক
পরিবর্তন আনার
প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’
বা
‘না’
ভোট
দিয়ে
মতামত
জানাবেন তারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন,
এটি
প্রচলিত জাতীয়
সংসদ
নির্বাচনের মতো
নয়।
শেষ
পর্যন্ত যদি
এটি
একটি
অবাধ
ও
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়,
তবে
তা
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রথম
ধাপ
হতে
পারে।
আর
গণভোটে
‘হ্যাঁ’
বিজয়ী
হলে
শুরু
হবে
মৌলিক
সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া।
আজ
সকাল
সাড়ে
৭টায়
গণভোট
ও
১৩তম
জাতীয়
সংসদ
নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু
হয়েছে,
যা
বিকেল
সাড়ে
৪টা
পর্যন্ত চলবে।
প্রধান
নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)
এএমএম
নাসির
উদ্দিন
আশা
প্রকাশ
করেছেন,
সবার
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি
সুষ্ঠু,
সুন্দর,
শান্তিপূর্ণ ও
উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এর
আগে
আওয়ামী লীগ
সরকারের অধীনে
অনুষ্ঠিত শেষ
তিনটি
জাতীয়
নির্বাচন ছিল
বিতর্কিত। ২০১৪
সালের
নির্বাচন ‘একতরফা’,
২০১৮
সালের
নির্বাচন ‘মধ্যরাতের ভোট’
এবং
২০২৪
সালের
নির্বাচন ‘ডামি
নির্বাচন’ হিসেবে
পরিচিতি পায়।
শেষ
তিনজন
প্রধান
নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে
দুজন
বর্তমানে কারাগারে। অতীতের
এসব
নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার
ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে
পারেননি।
ফলে
এবারের
নির্বাচন ঘিরে
জনগণের
মধ্যে
ব্যাপক
উৎসাহ
দেখা
গেছে।
বিচ্ছিন্ন কিছু
ঘটনা
ছাড়া
নির্বাচনী প্রচার
মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল।
ভোটের
দিনও
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ
বজায়
থাকবে
বলে
আশা
করছে
নির্বাচন কমিশন
(ইসি)। নির্বাচন পরিচালনা ও
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া
হয়েছে। ভোটের
দিনে
সশস্ত্র বাহিনী,
পুলিশ
ও
বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯
লাখের
বেশি
সদস্য
দায়িত্ব পালন
করবেন।
গত
দুই
দিন
ধরে
উৎসবের
আমেজে
অনেক
মানুষকে বাস,
লঞ্চ
ও
ট্রেনে
করে
ঢাকা
ছেড়ে
গ্রামের বাড়ির
পথে
যেতে
দেখা
গেছে।
এক
প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে
শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত
করা
হয়েছে। ২৯৯টি
আসনে
অনুষ্ঠিত এ
নির্বাচনে ইসিতে
নিবন্ধিত ৬০টি
দলের
মধ্যে
বিএনপি,
জামায়াতে ইসলামী,
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি
(এনসিপি),
জাতীয়
পার্টি
ও
ইসলামী
আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি
দল
অংশ
নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায়
আওয়ামী লীগের
নিবন্ধন স্থগিত
করেছে
ইসি,
ফলে
দলটি
নির্বাচনে অংশ
নিচ্ছে
না।
১৯৯১
সাল
থেকে
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে মূল
প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে
আওয়ামী লীগ
ও
বিএনপির মধ্যে।
আওয়ামী লীগের
অনুপস্থিতিতে এবারের
নির্বাচনে প্রধান
লড়াই
হবে
বিএনপি
ও
জামায়াতে ইসলামী
নেতৃত্বাধীন জোটের
মধ্যে।
স্বাধীনতার পর
প্রথমবারের মতো
জামায়াতে ইসলামী
জাতীয়
নির্বাচনে বড়
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে
আবির্ভূত হয়েছে।
এ
নির্বাচনে ভোটার
সংখ্যা
১২
কোটির
বেশি।
এর
মধ্যে
১৮
থেকে
৩৭
বছর
বয়সী
ভোটার
৫
কোটির
বেশি।
মোট
ভোটারের প্রায়
অর্ধেকই নারী।
বিশ্লেষকদের মতে,
তরুণ
ও
নারী
ভোটাররা ফল
নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে
পারেন।
নির্বাচন ও সংস্কারের প্রেক্ষাপট
২০০৮
সালে
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়
নবম
জাতীয়
সংসদ
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ
ক্ষমতায় আসে।
পরে
উচ্চ
আদালতের রায়ের
পর
২০১১
সালে
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার
ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা
হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে,
২০০৮
সালে
ক্ষমতায় আসার
পর
শেখ
হাসিনার সরকার
ধীরে
ধীরে
কর্তৃত্ববাদী হয়ে
ওঠে।
গণতান্ত্রিক পরিসর
সংকুচিত হতে
থাকে।
দলীয়
সরকারের অধীনে
বিতর্কিত নির্বাচনগুলো পুরো
নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস
করে
দেয়।
পতনের
আগে
আওয়ামী লীগ
সভাপতি
ও
সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা
রাজনৈতিক অঙ্গনে
কর্তৃত্ববাদী হিসেবে
পরিচিত
হন।
২০২৪
সালের
৫
আগস্ট
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ
সরকারের পতন
ঘটে।
দলটির
সভাপতি
শেখ
হাসিনাসহ শীর্ষ
অনেক
নেতা
ভারতে
আশ্রয়
নেন।
৮
আগস্ট
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার
শপথ
নেয়।
শুরু
থেকেই
এই
সরকারের তিনটি
অঙ্গীকার ছিল—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন।
দায়িত্ব নেওয়ার দেড়
বছর
পর
আজ
জাতীয়
সংসদ
নির্বাচন আয়োজন
করছে
অন্তর্বর্তী সরকার।
জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কিছু ঘটনার বিচার
ইতিমধ্যে হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি
মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা
ও
সাবেক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে
মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
সংস্কারের লক্ষ্যে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার
বিভাগ,
দুর্নীতি দমন
কমিশন,
পুলিশ
ও
জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে
একাধিক
সংস্কার কমিশন
গঠন
করা
হয়।
গত
বছরের
১৫
ফেব্রুয়ারি জাতীয়
ঐকমত্য
কমিশন
ছয়টি
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে
ঐকমত্য
গড়ে
তোলার
কাজ
শুরু
করে।
৩০টি
রাজনৈতিক দলের
সঙ্গে
দীর্ঘ
আলোচনার পর
৮৪টি
প্রস্তাবে ঐকমত্য
হয়।
জুলাই
মাসে
এসব
প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি
জাতীয়
সনদ
প্রস্তুত করা
হয়।
এর
মধ্যে
৪৮টি
প্রস্তাব সংবিধানসংক্রান্ত, যা
আজ
গণভোটে
উত্থাপিত হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে,
কার্যকর ভারসাম্যের অভাব
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য
গুরুতর
হুমকি।
ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীর পদকে
কর্তৃত্ববাদী রূপ
দিয়েছে। ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের
উত্থান
রোধ
এবং
রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও
প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করাই
সাংবিধানিক সংস্কারের প্রধান
লক্ষ্য।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে
গণভোটে
‘হ্যাঁ’
বিজয়ী
হলে
প্রধানমন্ত্রীর একক
ক্ষমতা
কিছুটা
কমবে
এবং
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
কিছু
ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে
নিয়োগ
হবে
একটি
কমিটির
মাধ্যমে, যেখানে
সরকার,
বিরোধী
দল
ও
বিশেষ
ক্ষেত্রে বিচার
বিভাগের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
সংসদ
সদস্যরা ভোটদানে আরও
স্বাধীনতা পাবেন।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের
মধ্যে
ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাড়বে। তবে
কিছু
বিষয়ে
বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।
‘হ্যাঁ’ জিতলে
পরবর্তী সংসদ
নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ
হিসেবেও কাজ
করবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান
ছিলেন
অধ্যাপক আলী
রিয়াজ,
যিনি
বর্তমানে প্রধান
উপদেষ্টার বিশেষ
সহকারী
হিসেবে
দায়িত্ব পালন
করছেন।
তিনি
বলেন,
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ
কখনোই
মসৃণ
নয়
এবং
তা
স্বল্প
সময়ে
অর্জিত
হয়
না।
এই
যাত্রায় কিছু
গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক থাকে।
বাংলাদেশ এবার
সেই
সুযোগ
পেয়েছে, যা
এসেছে
বহু
প্রাণ
ও
রক্তের
বিনিময়ে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
নিবন্ধন স্থগিত
থাকায়
আওয়ামী লীগ
নির্বাচনে অংশ
নিতে
পারছে
না।
আরও
নয়টি
নিবন্ধিত দলও
অংশ
নিচ্ছে
না,
যার
মধ্যে
আওয়ামী লীগ
নেতৃত্বাধীন ১৪
দলীয়
জোটের
কয়েকটি দল
রয়েছে।
আওয়ামী লীগের
অনেক
নেতা-কর্মী দেশ ও
বিদেশে
আত্মগোপনে থেকে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে না
যাওয়ার আহ্বান
জানাচ্ছেন। এতে
ভোটার
উপস্থিতি নিয়ে
কিছুটা
সংশয়
রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল
ফজল
মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন,
গত
দেড়
দশক
ধরে
দেশ
গণতান্ত্রিক ঘাটতির
মধ্যে
ছিল।
যারা
এখন
ত্রিশের কোঠায়,
তারা
ভোট
দেওয়ার সুযোগ
পাননি।
যারা
জনগণকে
ভোটাধিকার থেকে
বঞ্চিত
করেছে,
তারা
আইনি
প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। এতে
ভোটার
উপস্থিতি কমবে
না।
অবাধ নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
২০২৪
সালের
নভেম্বরে এএমএম
নাসির
উদ্দিনের নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশন
দায়িত্ব গ্রহণ
করে।
আজকের
নির্বাচন ও
গণভোট
এই
কমিশনের প্রথম
বড়
পরীক্ষা।
সুজন
(সুশাসনের জন্য
নাগরিক)
ইসির
কিছু
বিষয়ে
নমনীয়তার সমালোচনা করেছে।
তবে
সিইসি
বলেছেন,
সংবিধান ও
আইনের
আওতায়
অবাধ,
সুষ্ঠু
ও
বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার অনুযায়ী তারা
কাজ
করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে,
আজকের
নির্বাচন কতটা
অবাধ,
সুষ্ঠু
ও
গ্রহণযোগ্য হয়—তার ওপরই নির্ভর
করছে
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপ।
সুজনের
সম্পাদক বদিউল
আলম
মজুমদার বলেন,
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রথম
ধাপ
হলো
অবাধ,
নিরপেক্ষ ও
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সবাই
দায়িত্বশীল আচরণ
করলে
গণতন্ত্রের পথে
প্রথম
পদক্ষেপ নেওয়া
সম্ভব
হবে।
(প্রতিবেদনটি
প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম আলো পত্রিকায়)

No comments